(৬) পানি থাকা সত্ত্বেও কুলুখ নেওয়া অথবা কুলুখ নেওয়ার পর পুনরায় পানি নিয়ে ইস্তিঞ্জা করা

(৬) পানি থাকা সত্ত্বেও কুলুখ নেওয়া অথবা কুলুখ নেওয়ার পর পুনরায় পানি নিয়ে ইস্তিঞ্জা করা :

পানি থাকা অবস্থায় কুলুখ নেওয়া শরী‘আত সম্মত নয়। পানি না পাওয়া গেলে কুলুখ নেওয়া যাবে। তবে পুনরায় পানি ব্যবহার করতে হবে না। কুলুখ নেওয়ার পর পানি নেওয়া সম্পর্কে যে হাদীছ বর্ণনা করা হয় তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ فِىْ أَهْلِ قُبَاءَ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّوْنَ أَنْ يَتَطَهَّرُوْا وَاللهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِيْنَ فَسَأَلَهُمْ رَسُوْلُ اللهِ ؟ فَقَالُوْا نَتَّبِعُ الْحِجَارَةَ الْمَاءَ.

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নিম্নোক্ত আয়াত কুবাবাসীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ‘এতে এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে ভালবাসে। আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জনকারীকে ভালবাসেন’ (তওবা ১০৮)। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেছিল, (আমরা ইস্তিঞ্জা করার সময়) ঢিল নেওয়ার পর পানি নিই।

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল বা মিথ্যা। এই বর্ণনার কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না।[1] ইমাম বাযযার এটি বর্ণনা করে বলেন, ‘যুহরী থেকে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযীয ছাড়া অন্য কেউ একে বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। আর সে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছে।[2] ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিঃ) বলেন,

مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيْزِ ضَعَّفَهُ أَبُوْ حَاتِمٍ فَقَالَ لَيْسَ لَهُ وَلَا لِأَخَوَيْهِ عِمْرَانَ وَعَبْدِ اللهِ حَدِيْثٌ مُسْتَقِيْمٌ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ شَبِيْبٍ ضَعِيْفٌ أَيْضًا.

মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল আযীযকে আবু হাতেম যঈফ বলেছেন। তিনি আরো বলেন, তার ও তার দুই ভাই ইমরান ও আব্দুল্লাহ কারো একটি হাদীছও সঠিক নয়। তাছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু শাবীবও দুর্বল।[3]

উক্ত বর্ণনার বিরোধী ছহীহ হাদীছ :

উক্ত হাদীছ যে জাল তার বাস্তব প্রমাণ হল নিম্নের ছহীহ হাদীছ, যেখানে ঢিলের কথাই নেই।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ  قَالَ نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ فِى أَهْلِ قُبَاءَ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّوْنَ أَنْ يَتَطَهَّرُوْا قَالَ كَانُوْا يَسْتَنْجُوْنَ بِالْمَاءِ فَنَزَلَتْ فِيْهِمْ هَذِهِ الآيَةُ.

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এই আয়াতটি কুবাবাসীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ‘এতে এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে ভালবাসে’ (তওবা ১০৮)। তিনি বলেন, তারা পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করত।[4] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ أَيُّوْبَ الْأَنْصَارِيِّ وَجَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ وَأَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ هَذِهِ الْآيَةَ نَزَلَتْ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّوْنَ أَنْ يَتَطَهَّرُوْا وَاللهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِيْنَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ إِنَّ اللهَ قَدْ أَثْنَى عَلَيْكُمْ فِى الطُّهُوْرِ فَمَا طُهُوْرُكُمْ قَالُوْا نَتَوَضَّأُ لِلصَّلَاةِ وَنَغْتَسِلُ مِنْ الْجَنَابَةِ وَنَسْتَنْجِىْ بِالْمَاءِ قَالَ فَهُوَ ذَاكَ فَعَلَيْكُمُوْهُ.

আবু আইয়ূব আনছারী, জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ ও আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়- ‘তথায় (কুবায়) এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা পবিত্রতা লাভ করাকে ভালবাসে এবং আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, হে আনছারগণ! এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পবিত্রতার প্রশংসা করেছেন। তোমরা কিভাবে পবিত্রতা অর্জন কর? তারা বলল, আমরা ছালাতের জন্য ওযূ করে থাকি, অপবিত্রতা হতে গোসল করে থাকি এবং পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করে থাকি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এটাই তার কারণ। সুতরাং তোমরা সর্বদা এটা করতে থাকবে।[5]

মূল কথা হল, অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীরা শুধু ঢিল দ্বারা ইস্তিঞ্জা করত। কিন্তু কুবাবাসীরা অন্যদের তুলনায় শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতেন। সে জন্যই আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন।

আরেকটি জাল হাদীছ :

عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا مُرْنَ أَزْوَاجَكُنَّ أَنْ يَتَّبِعُوْا الْحِجَارَةَ بِالْمَاءِ مِنْ أَثَرِ الْغَائِطِ وَالْبَوْلِ فَإِنِّيْ أَسْتَحْيِيْهِمْ وَإِنَّ النَّبِيَّ  كاَنَ يَفْعَلُهُ.

আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে বলে দাও, তারা যেন পেশাব-পায়খানার সময় ঢিল নেওয়ার পর পানি ব্যবহার করে। আমি তাদেরকে বলতে লজ্জাবোধ করছি। কারণ রাসূল (ছাঃ) এটা করেন।[6]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল। এ শব্দে কোন বর্ণনা নেই। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, এর কোন ভিত্তি নেই।[7] উক্ত বর্ণনার বিরোধী সরাসরি ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। যেখানে কুলুখ নেওয়ার কথা নেই; বরং শুধু পানি নেওয়ার কথা রয়েছে। যেমন-

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ مُرْنَ أَزْوَاجَكُنَّ أَنْ يَسْتَطِيْبُوْا بِالْمَاءِ فَإِنِّىْ أَسْتَحْيِيْهِمْ فَإِنَّ رَسُوْلَ اللهِ  كَانَ يَفْعَلُهُ.

আয়েশা (রাঃ) বলেন, তোমরা তোমাদের স্বামীদের বলে দাও, তারা যেন পানি দ্বারা পবিত্রতা হাছিল করে। কারণ আমি তাদেরকে বলতে লজ্জাবোধ করছি। নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তা করে থাকেন।[8]

অতএব সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উক্ত মিথ্যা প্রথাকে অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে। পানি থাকা সত্ত্বেও যেন কোন স্থানে কুলুখের স্তূপ সৃষ্টি না হয়। কারণ প্রকৃত ফযীলত পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করার মধ্যেই রয়েছে।

[1]. সিলসিলা যঈফাহ হা/১০৩১-এর ভাষ্য দ্রঃ। [2]. لا نعلم أحدا رواه عن الزهري الا محمد بن عبد العزيز ولا عنه الا ابنه- তালখীছ, পৃঃ ৪১, দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল হা/৪২, ১/৮২ পৃঃ। [3]. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, তালখীছুল হাবীর ফী আহাদীছির রাফইল কাবীর হা/১৫১; দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল হা/৪২, ১/৮২ পৃঃ। [4]. আবুদাঊদ হা/৪৪, ১/৭ পৃঃ, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়-১, অনুচ্ছেদ-২৩, সনদ ছহীহ; মুস্তাদরাক হাকেম হা/৬৭৩। [5]. ছহীহ ইবনে মাজাহ হা/৩৫৫, পৃঃ ২৯-এর শেষ হাদীছ, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৩৬৯, পৃঃ ৪৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৪১, ‘পেশাব-পায়খানার শিষ্টাচার’ অনুচ্ছেদ; আলোচনা দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ হা/১০৩১, ৩/১১৩ পৃঃ। [6]. ইরওয়াউল গালীল হা/৪২। [7]. ইরওয়াউল গালীল ১/৮২ পৃঃ। [8]. ছহীহ তিরমিযী হা/১৯, ১/১১ পৃঃ; ছহীহ নাসাঈ হা/৪৬, ১/৮ পৃঃ।

Posted from ইসলামী সাইট

This entry was posted in 02. পবিত্রতা (ওযূ ও তায়াম্মুম), কুলুখ নেওয়ার পর পুনরায় পানি নিয়ে ইস্তিঞ্জা করা, পানি থাকা সত্ত্বেও কুলুখ নেওয়া. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s